ডাকটিকিটের গল্পঃ পর্ব ১ - জার্মানির হাইপারইনফ্লেশন ডাকটিকিট
- উত্তরণ দত্ত

- 1 day ago
- 2 min read
‘ইনফ্লেশন’ - এই শব্দটার সাথে আজকের দিনে আমরা সবাই পরিচিত। ইনফ্লেশন, অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন নিয়ন্ত্রিত ইনফ্লেশন সুস্থ-সবল অর্থনীতির একটা সূচক। দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য বাড়ে। তার সাথে তাল মিলিয়ে বাড়াতে হয় মুদ্রায় লিখিত মূল্যের (ফেস ভ্যালুর) মান। মানে, আমরা ছোট বেলায় দেখেছি চার আনা, আট আনার কয়েন। কিন্তু এখন সেসব অতীত। বরং, দশ টাকার কয়েন এখন আকছার ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু সাধারণত এই ব্যাপারটা ঘটে ধীরে ধীরে, দশকের ব্যবধানে।
কিন্তু এমন যদি হয়, মাত্র কয়েক মাসের ফারাকেই জিনিসপত্রের দাম দশের ঘাতে বাড়তে থাকে...
এমনটাই হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীনই দ্রব্যমূল্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে বাড়তে থাকল আরও বোঝা। ভার্সাই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যাপক অর্থ যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ-বাবদ দিতে হচ্ছিল মিত্রশক্তির দেশগুলোকে। জার্মানির আমদানির ক্ষমতা কমতে থাকল। অন্যদিকে, জার্মানি ক্ষতিপূরণের অর্থ মেটাতে পারবে না ভেবে ফ্রান্স-বেলজিয়াম সৈন্য জার্মানির শিল্পাঞ্চল দখল করে বসে, সেখান থেকে উৎপাদিত শিল্পসামগ্রী (কয়লা, ইস্পাত ইত্যাদি) হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। জার্মান সরকার সেসময় শ্রমিকদের নির্দেশ দিল কাজ বন্ধ রেখে বিদেশি সৈন্যের মদত না করার। কাজেই কমতে লাগল দেশে উৎপাদিত শিল্পদ্রব্যের জোগানও। তার সাথে সাথে যুদ্ধের সময় যে কোটি কোটি মার্ক্স (তৎকালীন জার্মান মুদ্রা) মজুত করে রাখা হয়েছিল সেগুলো আবার বাজারে ফিরে আসতে থাকল।
দ্রব্যমূল্যবৃদ্ধি, আর তার সাথে সাথে টাকার জোগান বৃদ্ধি — এই দুইয়ের চাপে আমেরিকান ডলারের অনুপাতে জার্মান মার্ক্-এর মূল্য হু হু করে কমতে থাকল। এই সময়, কফিনে শেষ পেরেক পোঁতার মত, মিত্রশক্তির কাছে ঋণের বোঝা কমানোর তাগিদে তদানীন্তন সরকার সিদ্ধান্ত নিল আরও বেশি মার্ক্-মুদ্রা ছাপানোর। ১৯২২-এ প্রায় সাতশো শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটলো। ১৯২৩-এর নভেম্বর নাগাদ এক ট্রিলিয়ন জার্মান মার্ক্স-এর মূল্য দাঁড়িয়েছিল মাত্র এক আমেরিকান ডলারে। ১৯২৩-এ কয়েক মাসের ব্যবধানেই এমন মূল্যবৃদ্ধি ঘটল যে, জানুয়ারিতে একটা পাউরুটি লোফের দাম যেখানে ২৫০ মার্ক্স ছিল, সেখানে নভেম্বরে তার দাম হল ২০০,০০০ মিলিয়ন মার্ক্স। অর্থনীতির পরিভাষায় এল “হাইপারইনফ্লেশন”।
এবারে ভাবুন, আপনি পাউরুটি কিনতে ২০ টাকা দেন। যদি কিছু মাস পরেই তার দাম ২০০ কোটি হয়ে যায়, তাহলে আপনাকে দাম চোকাতে কতগুলো ২০০০ টাকার নোট পকেটে রাখতে হবে (যদি আদৌ থাকে)! কাজেই প্রথমে শুরু হল এক মিলিয়ন মার্ক্ মূল্যের নোট ছাপানো। তাতেও যখন কোলালো না, ছাপানো হল এক বিলিয়ন মার্ক্ মূল্যের নোট।
একইরকম ব্যাপার ঘটল ডাকব্যবস্থার ক্ষেত্রেও। কয়েকদিন আগেও একটা চিঠি পোস্ট করতে যেখানে প্রয়োজন হত কয়েকশ মার্কের ডাকটিকিটের, মূল্যবৃদ্ধির ফলে সেই একই চিঠি একই দূরত্ব পাঠাতে ডাক মাশুল হল বহুগুণ। ১৯২৩-এর অগাস্ট মাসে, জার্মানির ছোট্ট শহর গ্রাইজের একটি সরকারি অফিস থেকে পাঠানো চিঠি থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০,০০০ মার্ক্সের ডাকমাশুল দিতে প্রেরককে লাগাতে হয়েছে বাইশটি ৫০০ মার্কের এবং পঁয়তাল্লিশটি ২০০ মার্কের ডাকটিকিট। ডাকটিকিট লাগাতে গিয়ে খামের একপিঠ সম্পূর্ণ ভরে যাওয়ার পর ব্যবহার করতে হয়েছে অন্য পিঠটাও। সুতরাং, প্রয়োজন পড়ল নতুন ফেস ভ্যালুর ডাকটিকিটের। সঙ্গে সঙ্গেই নতুন ডিজাইনের ডাকটিকিট না বানিয়ে তাৎক্ষনিকভাবে পুরনো, কম মার্কের ডাকটিকিটের উপরেই তখন ছেপে দেওয়া হল নতুন মার্ক্মূল্য। যেমন ধরুন, পুরনো ১০০ মার্কের ডাকটিকিটের উপর ছেপে দেওয়া হল '১০০ হাজার' কথাটি, কিংবা, পুরনো ২০০ মার্কের ডাকটিকিটে ছাপা হল '২ মিলিয়ন', ০.১ মার্কের পুরনো ডাকটিকিটেই '৮০০ হাজার' ইত্যাদি। পরবর্তী নতুন ডিজাইনের ডাকটিকিট না ছেপে আসা পর্যন্ত এই ওভারপ্রিন্টেড ডাকটিকিটগুলিই চলতে থাকল ডাকমাশুল মেটাতে — চিঠিতে, খামে, ডাকের প্রয়োজনে।
আমার সংগ্রহের এমনই কয়েকটি ডাকটিকিটের ছবি থাকল নীচে। সাথে রইল আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশান অফ ফিলাটেলিক এক্সহিবিটর্স-এর ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত জেরি জেনসেনের সংগ্রহের একটি ছবি — সেই সাতষট্টিটি ডাকটিকিট সম্বলিত খাম।



Comments