ডাকটিকিটের গল্পঃ পর্ব ২ - ডাকটিকিটে প্রথম বাংলা হরফ
- উত্তরণ দত্ত

- 4 hours ago
- 3 min read
বিশ্বের প্রথম ডাকটিকিট — পেনি ব্ল্যাক-এর উপর লেখা হরফ ছিল ইংরাজি (পড়ুন, রোমান)। POSTAGE, ONE PENNY কথাগুলি ছাপা হয়েছিল রোমান হরফে। সে ১৮৪০ সালের কথা। ডাকটিকিটে বাংলাকে প্রথম স্থান পেতে লেগেছিল আরও ১১৬ বছর সময়। আর, তার পিছনেও হাত ছিল ভাষা আন্দোলনের।
১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাস। সেই সময়ের পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা, বাংলা, পাকিস্তানের নবনির্মিত সংবিধান অনুযায়ী মর্যাদা পেল সরকারি ভাষার, উর্দুর পাশাপাশি। তার আগে অবশ্য ঘটে গেছে দীর্ঘ আট বছরের ভাষার জন্য লড়াই। রেখে গেছে রক্তে রাঙা একুশে ফেব্রুয়ারী। সেই লড়াই শুধু সাংস্কৃতিক নয়, রাজনীতিকেও ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লিগ ইউনাইটেড ফ্রন্টের কাছে ধরাশায়ী হল নির্বাচনের যুদ্ধে। ইউনাইটেড ফ্রন্টের নির্বাচনী ইস্তেহারে বাংলা ভাষার মর্যাদার কথা উঠে এসেছিল বড়সড়ভাবেই। ‘উর্দু, এবং শুধুমাত্র উর্দু’ — স্বাধীনতার প্রাক্কালে এমনটাই নীতি ছিল যে জিন্নাহ তথা মুসলিম লিগ-এর, সেই মুসলিম লিগও ভাষা আন্দোলনের চাপে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোতে লিখেছিল সরকারি ভাষা হিসাবে বাংলাকে স্থান দেওয়ার কথা।
কাট টু, অক্টোবর, ১৯৫৬। বাংলা ইতিমধ্যে সরকারি ভাষার মর্যাদা পেয়েছে। সেই সময়, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন বসল পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায়। এর আগে পর্যন্ত এই ধরণের অধিবেশনগুলি হত রাজনৈতিক দিক থেকে প্রভাবশালী পশ্চিম পাকিস্তানেই। সেই প্রথম পূর্ব পাকিস্তানে বসল এই অধিবেশন (এবং খুব সম্ভবত শেষ বারের মতও)। আর, এর স্মারক হিসাবে পাকিস্তান ডাকবিভাগ থেকে প্রকাশ পেল তিনটি ডাকটিকিট। সবুজ, কালচে বাদামি আর লাল রঙের তিনটি ডাকটিকিটের ফেস ভ্যালু যথাক্রমে দেড়, দুই এবং বারো আনা। প্রত্যেকটিতেই পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্রের ছবি এবং সেই প্রথমবারের মত ডাকটিকিটে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি লেখা হল বাংলা হরফে। এর আগে পর্যন্ত শুধুমাত্র উর্দু এবং ইংরাজিতেই লেখা থাকত দেশের নাম। আর এর পর থেকে পাকিস্তানের সব ডাকটিকিটেই বাংলা, উর্দু, ইংরাজি — এই তিন ভাষাতেই লেখা হতে থাকল ‘পাকিস্তান’ কথাটি। এমনটা চলেছিল ১৯৭২ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবার পাকিস্তানের ডাকটিকিট থেকে বাদ পড়েছিল বাংলা।
তবে বাংলা ভাষা ঠিক কবে প্রথম বারের মতো জায়গা করেছিল ডাকটিকিটে, তা জানার জন্য এই ডাকটিকিটের থেকেও পিছিয়ে যেতে হবে মাসদুয়েক। বলতে হবে সেই ১৯৫৬-এরই ১৪ই অগাস্ট, পাকিস্তানের নবম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত একটি ডাকটিকিটের কথা। চাঁদের ফালি এবং তারা অঙ্কিত লাল রঙের এই ডাকটিকিটের নীচের দুইদিকের কোণায় লেখা এই ডাকটিকিটের ফেস ভ্যালু, বাঁদিকে উর্দুতে এবং ডানদিকের কোণে বাংলায় লেখা ‘২ আনা’। কিন্তু সে লেখা এতটাই বিকৃত, যে প্রথম দেখায় ‘আনা’ শব্দটিকে বাংলা নয়, বরং দেবনাগরী হরফে লেখা বলে মনে হতে পারে।
এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখের দাবি রাখে। এই ডাকটিকিটেরও বেশ কয়েকমাস আগে, মার্চ মাসে পাকিস্তানের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে যে ডাকটিকিট প্রকাশ করে ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান, তাতে, সেই সময় সরকারি ভাষা হওয়া সত্ত্বেও স্থান পায়নি বাংলা।
সরকারি ভাষার মর্যাদা পাওয়ার পরেও, ১৯৫৬-এর প্রথম ডাকটিকিটে বাংলার অনুপস্থিতি এবং দ্বিতীয়তে বিকৃত বাংলা হরফ — উপরের এই দুটি বিষয়ই হয়ত অক্টোবরের তিনটি ডাকটিকিট প্রকাশের সাথে রাজনৈতিক গুরুত্ব যোগ করে দেয়। বিশিষ্ট ডাকটিকিট সংগ্রাহক এবং প্রবন্ধকার শোভেন সান্যাল তাঁর ‘ডাকটিকিটের আড়ালে’ বইতে লিখছেন, “১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার উপযুক্ত মর্যাদার দাবিতে আত্মাহুতি দিয়ে বাঙালিরা যে আন্দোলন শুরু করেছিল তার জেরে পূর্ব পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ অবস্থা ১৯৫৬ সালেও বেশ অস্থির। (পাকিস্তানের নেতারা) ভালই বুঝতে পারছিল যে তারা যদি তাড়াতাড়ি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের শান্ত করতে না পারে তা হলে তাদের বিপদ। বিপদ পাকিস্তানের অখণ্ডতারও। সেই উদ্দেশ্যেই তারা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সাময়িকভাবে শান্ত করবার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছিল। তারই একটা নমুনা এই ডাকটিকিটগুলো। তারা যে পূর্ব পাকিস্তানকে কতটা গভীরভাবে ভালবাসে তার প্রমাণ হিসেবেই তারা এই প্রথম ঢাকায় পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের অধিবেশন উপলক্ষে এই বিশেষ স্মারক ডাকটিকিটগুলি প্রকাশ করেছিল তার উপরে বাংলায় পাকিস্তান কথাটি লিখে। পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনের জেরে ঢাকায় জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যাতে কোনও বিঘ্ন না ঘটে সেজন্যই পাকিস্তান সরকার এই ডাকটিকিটগুলির উপরে বাংলা অক্ষরে পাকিস্তানও লিখেছিল।”
স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলাদেশ সরকার ভাষা দিবস এবং একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে একাধিক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। কিন্তু, তার অনেক আগেই, ১৯৫৬ সালের বিশ্বের প্রথম বাংলায় লেখা ডাকটিকিটগুলিতে রয়ে গেছে অমর একুশের ছাপ।
আমার সংগ্রহের সেই তিনটি ডাকটিকিটের ছবি রইল নীচে। তার সাথে থাকল ১৪ই অগাস্ট, ১৯৫৬ সালের বিকৃত বাংলায় ‘আনা’ লেখা ডাকটিকিটটি (ছবি: ইন্টারনেট)। আরও রইল, আমার সংগ্রহ থেকে, বাংলাদেশ ডাকবিভাগ থেকে সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের কিছু স্মারক ডাকটিকিট।



ডাকটিকিটের গল্পের সব পর্ব গুলি পড়ুন বুকমেকার্স ও বন্ধুর - নিয়মিত বিভাগে এই লিঙ্ক থেকে।


Comments